ঢাকা ০২:৩৫ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৪ জুন ২০২৪, ৯ আষাঢ় ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

প্রত্যাশা মতো চান্স না পেয়ে নদীতে ঝাঁপ দিয়ে তরুণীর আত্মহত্যা

ভর্তি পরীক্ষায় প্রত্যাশামতো কোথাও চান্স না পেয়ে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে পদ্মা নদীতে ঝাঁপ দিয়ে এক তরুণী আত্মহত্যা করেছেন। নিহতের নাম পিউ কর্মকার (২০)।

মঙ্গলবার (৩০ এপ্রিল) সন্ধ্যায় রাজবাড়ী সদর উপজেলার মিজানপুর ইউনিয়নের গোদারবাজার পদ্মা নদী এলাকায় ঝাঁপ দেয়। পরে তাকে রাজবাড়ী সদর হাসপাতালে নিয়ে এলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

পিউ রাজবাড়ী পৌরসভার ৩নং ওয়ার্ড বিনোদপুর গ্রামের কৃষ্ণপদ কর্মকারের মেয়ে।

পিউ রাজবাড়ী সরকারি কলেজের বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে এ বছর পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা অংশ নিয়েছিল।

নদীতে ঝাঁপ দেওয়ার আগে পিউ কর্মকার এক ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, ‘গুচ্ছ আমার শেষ ভরসা ছিল। জানি না কবে রেজাল্ট দিবে। পরীক্ষাও মোটামুটি হয়েছিল একটা আশা ছিল কিন্তু আমার ভাগ্য সেই আশাটাও পূরণ করতে দিল না। ৫টা অপশন থাকে তার মধ্যে আমি বায়োলজি আর ইংরেজি এর বৃত্ত ভরাট করে ফেলেছিলাম ভুল করে আজকে সেটা দেখলাম। কিন্তু আমি উত্তর করেছিলাম বাংলার। আমার সব স্বপ্ন শেষ। একে একে ঢাবি, রাবি, জাবি থেকে একটু একটুর জন্য ধাক্কা খাই। জানি এটাও আমার ভাগ্যের জন্য চেষ্টা আমার কম ছিল না। সারাদিন রাত এক করে পড়তাম। বাবা মার অনেক স্বপ্ন ছিল আমাকে নিয়ে কিন্তু আমি কিচ্ছু দিতে পারি নাই। দাদার ইচ্ছা ছিল আমাকে ডাক্তার বানাবে। আমারও স্বপ্ন ছিল ছোট থেকেই যে ডাক্তার হবো। আমার ভাগ্য এতটাই খারাপ ছিল মেডিকেল অ্যাডমিশন এর প্রিপারেশন নেওয়াও শুরু করি কিন্তু মেডিকেলেও বসতে পারি না। এটা থেকেও বিশাল একটা ধাক্কা খাই। অনেক ভেঙে পড়েছিলাম তাও হাল ছাড়ি নাই। এই অ্যাডমিশন পিরিয়ডটা যে কতটা কষ্ট দিয়েছে আমাকে।’

তিনি আরও লিখেন, ‘এই সব আর আমি নিতে পারতেছি না। আমি শুধু একটা আশ্রয় খুঁজছিলাম শেষ আশ্রয় এটাও শেষ হইল। অনেক মানুষ অনেক আত্মীয় এর অনেক কথা শোনা লাগছে। বাবার একটু ফিনানসিয়াল সমস্যা ছিল এ জন্য ঢাকা গিয়ে পড়তে হবে কেন। কিন্তু আমি ধৈর্য ধরে ছিলাম যে পারব। কিন্তু আমি আর পারলাম না। সারাটা দিন ঘরের মধ্যে একা একা বসে থাকি। মানুষের কত ফ্রেন্ড কত কিছু কিন্তু আমি আমার পাশে কাউকে পাই নাই। সব থেকে প্রয়োজন ছিল যাকে, যাকে আমার বেস্ট ফ্রেন্ড ভাবতাম তাকেও আমি আমার পাশে পাই নাই। হইত আমাকে সাপোর্ট করার মতো কেউ থাকলে আজকে এই মৃত্যুটা আমার হইতো না। সেকেন্ড টাইমের প্রিপারেশন নেওয়ারও আমার কোনো মানসিক বা শারীরিক শক্তি নাই। আমার জীবনটা এখানেই থেমে গেল।’

সুইসাইড নোটে লিখেছেন, ‘মায়ের কাছে গিয়ে মাঝে মধ্যে কাঁদতাম মাও বুঝে নাই আমাকে। আমি একটা বোঝা সবার কাছে। আমার মৃত্যুর জন্য আমার এই বড় বড় স্বপ্নগুলোই দায়ী। আমি আমার বাবা, মার স্বপ্ন পূরণ করতে পারি নাই। আমাকে শেষ বারের মতো দেখতে চাইলে নদীর জলেই খুঁজো। আমার মৃত্যুটা এভাবেও চাই নাই ভালো থাইকো সবাই। আমি আমার এই জীবনটা আর নিতে পারছি না। আমারে মাফ করে দিও সবাই। এভাবে দম বন্ধ করে বাঁচতে পারতেছি না আর।’

রাজবাড়ী সদর হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক মোহাম্মদ সাইফুল বলেন, হাসপাতালে নিয়ে আসার আগেই তার মৃত্যু হয়েছে।

এ বিষয়ে রাজবাড়ীর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) মো. ইফতেখারুজ্জামান গণমাধ্যমকে বলেন, জানতে পেরেছি— পিউ কর্মকার পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে না পেরে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিল। সে ডিপ্রেশনে ভুগছিল। তাই সে তার নিজ ফেসবুক অ্যাকাউন্টে স্ট্যাটাস দিয়ে আত্মহত্যা করেছে। তার মরদেহ রাজবাড়ী সদর হাসপাতালের মর্গে রয়েছে। কোনো অভিযোগ না থাকলে ময়নাতদন্ত ছাড়াই মরদেহটি পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

জনপ্রিয় সংবাদ

হু হু করে বাড়ছে তিস্তার পানি নদীপাড়ে আতঙ্ক বিরাজ

প্রত্যাশা মতো চান্স না পেয়ে নদীতে ঝাঁপ দিয়ে তরুণীর আত্মহত্যা

Update Time : ১০:৩১:১১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৪

ভর্তি পরীক্ষায় প্রত্যাশামতো কোথাও চান্স না পেয়ে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে পদ্মা নদীতে ঝাঁপ দিয়ে এক তরুণী আত্মহত্যা করেছেন। নিহতের নাম পিউ কর্মকার (২০)।

মঙ্গলবার (৩০ এপ্রিল) সন্ধ্যায় রাজবাড়ী সদর উপজেলার মিজানপুর ইউনিয়নের গোদারবাজার পদ্মা নদী এলাকায় ঝাঁপ দেয়। পরে তাকে রাজবাড়ী সদর হাসপাতালে নিয়ে এলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

পিউ রাজবাড়ী পৌরসভার ৩নং ওয়ার্ড বিনোদপুর গ্রামের কৃষ্ণপদ কর্মকারের মেয়ে।

পিউ রাজবাড়ী সরকারি কলেজের বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে এ বছর পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা অংশ নিয়েছিল।

নদীতে ঝাঁপ দেওয়ার আগে পিউ কর্মকার এক ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, ‘গুচ্ছ আমার শেষ ভরসা ছিল। জানি না কবে রেজাল্ট দিবে। পরীক্ষাও মোটামুটি হয়েছিল একটা আশা ছিল কিন্তু আমার ভাগ্য সেই আশাটাও পূরণ করতে দিল না। ৫টা অপশন থাকে তার মধ্যে আমি বায়োলজি আর ইংরেজি এর বৃত্ত ভরাট করে ফেলেছিলাম ভুল করে আজকে সেটা দেখলাম। কিন্তু আমি উত্তর করেছিলাম বাংলার। আমার সব স্বপ্ন শেষ। একে একে ঢাবি, রাবি, জাবি থেকে একটু একটুর জন্য ধাক্কা খাই। জানি এটাও আমার ভাগ্যের জন্য চেষ্টা আমার কম ছিল না। সারাদিন রাত এক করে পড়তাম। বাবা মার অনেক স্বপ্ন ছিল আমাকে নিয়ে কিন্তু আমি কিচ্ছু দিতে পারি নাই। দাদার ইচ্ছা ছিল আমাকে ডাক্তার বানাবে। আমারও স্বপ্ন ছিল ছোট থেকেই যে ডাক্তার হবো। আমার ভাগ্য এতটাই খারাপ ছিল মেডিকেল অ্যাডমিশন এর প্রিপারেশন নেওয়াও শুরু করি কিন্তু মেডিকেলেও বসতে পারি না। এটা থেকেও বিশাল একটা ধাক্কা খাই। অনেক ভেঙে পড়েছিলাম তাও হাল ছাড়ি নাই। এই অ্যাডমিশন পিরিয়ডটা যে কতটা কষ্ট দিয়েছে আমাকে।’

তিনি আরও লিখেন, ‘এই সব আর আমি নিতে পারতেছি না। আমি শুধু একটা আশ্রয় খুঁজছিলাম শেষ আশ্রয় এটাও শেষ হইল। অনেক মানুষ অনেক আত্মীয় এর অনেক কথা শোনা লাগছে। বাবার একটু ফিনানসিয়াল সমস্যা ছিল এ জন্য ঢাকা গিয়ে পড়তে হবে কেন। কিন্তু আমি ধৈর্য ধরে ছিলাম যে পারব। কিন্তু আমি আর পারলাম না। সারাটা দিন ঘরের মধ্যে একা একা বসে থাকি। মানুষের কত ফ্রেন্ড কত কিছু কিন্তু আমি আমার পাশে কাউকে পাই নাই। সব থেকে প্রয়োজন ছিল যাকে, যাকে আমার বেস্ট ফ্রেন্ড ভাবতাম তাকেও আমি আমার পাশে পাই নাই। হইত আমাকে সাপোর্ট করার মতো কেউ থাকলে আজকে এই মৃত্যুটা আমার হইতো না। সেকেন্ড টাইমের প্রিপারেশন নেওয়ারও আমার কোনো মানসিক বা শারীরিক শক্তি নাই। আমার জীবনটা এখানেই থেমে গেল।’

সুইসাইড নোটে লিখেছেন, ‘মায়ের কাছে গিয়ে মাঝে মধ্যে কাঁদতাম মাও বুঝে নাই আমাকে। আমি একটা বোঝা সবার কাছে। আমার মৃত্যুর জন্য আমার এই বড় বড় স্বপ্নগুলোই দায়ী। আমি আমার বাবা, মার স্বপ্ন পূরণ করতে পারি নাই। আমাকে শেষ বারের মতো দেখতে চাইলে নদীর জলেই খুঁজো। আমার মৃত্যুটা এভাবেও চাই নাই ভালো থাইকো সবাই। আমি আমার এই জীবনটা আর নিতে পারছি না। আমারে মাফ করে দিও সবাই। এভাবে দম বন্ধ করে বাঁচতে পারতেছি না আর।’

রাজবাড়ী সদর হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক মোহাম্মদ সাইফুল বলেন, হাসপাতালে নিয়ে আসার আগেই তার মৃত্যু হয়েছে।

এ বিষয়ে রাজবাড়ীর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) মো. ইফতেখারুজ্জামান গণমাধ্যমকে বলেন, জানতে পেরেছি— পিউ কর্মকার পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে না পেরে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিল। সে ডিপ্রেশনে ভুগছিল। তাই সে তার নিজ ফেসবুক অ্যাকাউন্টে স্ট্যাটাস দিয়ে আত্মহত্যা করেছে। তার মরদেহ রাজবাড়ী সদর হাসপাতালের মর্গে রয়েছে। কোনো অভিযোগ না থাকলে ময়নাতদন্ত ছাড়াই মরদেহটি পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে।